প্রতিবন্ধীতার গল্প(৪) নিঃশব্দ প্রতিবন্ধীর আর্তনাদ
———————————————————
লেখক: এ,এস,এম,রেজাউল করিম(পারভেজ)
জেলা শহরের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবসায়ীদের একজন ছিলেন হাজী আব্দুল কাদের। বিশাল বাড়ি, বিস্তৃত জমিজমা, ব্যবসার সুনাম- সবকিছুর মাঝেও তাঁর পৃথিবী বলতে ছিল একজনই, তাঁর একমাত্র ছেলে রায়হান।
রায়হান জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী।
কিন্তু প্রকৃতি যেন তার কণ্ঠ কেড়ে নিয়ে বিনিময়ে তাকে দিয়েছিল অসাধারণ মেধা, সৌন্দর্য আর এক গভীর অনুভবী মন।
সে কথা বলতে পারত না, কিন্তু তার লেখা যেন মানুষের হৃদয়ের গোপন দরজা খুলে দিত।
তার কবিতায় ছিল নীরব মানুষের কান্না, আকাশভরা শূন্যতা, আর জীবনের অনুচ্চারিত বেদনা।
স্থানীয় পত্রিকায় প্রায়ই ছাপা হতো তার কবিতা। শহরের শিক্ষক, সাংবাদিক, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিঃশব্দে তার লেখা পড়তেন।
অনেকেই তাকে চিনত।
অনেকেই তাকে ভালোবাসত।
রায়হান শুধু কবিই ছিল না- তার হাতে যেন জাদু ছিল। কাঠ, কাগজ, কাচ আর মাটির টুকরো দিয়ে সে এমন শোপিস ও খেলনা বানাত, যা দেখে এলাকার মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকত।
এই সব গুণেই বহু মেয়ের পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছিল সে।
কিন্তু তার জীবনে সত্যিকারের আলো হয়ে এসেছিল সুমি।
বিয়ের আগেই পরিবারের সম্মতিতে মোবাইল বার্তায় তাদের পরিচয় হয়।
সুমি রায়হানের বার্তা পড়ে অবাক হয়েছিল-একজন মানুষ কথা বলতে না পারলেও কত গভীরভাবে ভাবতে পারে!
সেই মুগ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ভালোবাসা।
ধুমধাম করে তাদের বিয়ে হয়।
তারপর কিছুদিনের মধ্যেই জন্ম নেয় তাদের ছেলে-“শান্ত”।
ছোট্ট শিশুর হাসিতে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল সেই বাড়ি।
সবকিছু বদলে গেল এক বিকেলে।
হঠাৎ হৃদরোগে মারা গেলেন রায়হানের বাবা।
সেদিন যেন রায়হানের পৃথিবীর শেষ আশ্রয়টুকু ভেঙে পড়ল।
বাবার মৃত্যুর পর বিশাল বাড়ি আর বিপুল সম্পত্তি যেন শকুনের চোখে ধরা পড়ল।
সবার আগে সেই লোভের আগুন জ্বলে উঠল সুমির মা জুলেখা বানুর মনে।
তার সঙ্গে ছিল তার আত্মীয়স্বজন এবং সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষটি- রাসেল।
রাসেল ছিল হাসিমুখে বিষ ঢালতে জানা মানুষ।
মুখোশ পরা সাক্ষাৎ পিচাশ, ভিতরে থাকত সকল সময় হিংস্র ষড়যন্ত্র।
তাদের লক্ষ্য একটাই-
রায়হানকে সরিয়ে সম্পত্তি দখল।
প্রথমে তারা সুমির মনে সন্দেহ ঢোকানোর চেষ্টা করল।
“রায়হান অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশছে।”
“সে আবার বিয়ে করবে।”
“তোমার ছেলে কিছুই পাবে না।”
কিন্তু সুমি বিশ্বাস করল না।
সে বলল,
“রায়হান আমাকে ঠকাবে না। সে আমার স্বামী। সে অসহায়, আমি ছাড়া তার কেউ নেই।”
এই ব্যর্থতায় রাসেল আরও ভয়ংকর পরিকল্পনা করল।
এক সন্ধ্যায় বাজার থেকে ফেরার পথে রায়হানকে লক্ষ্য করে রাসেল তার লোক দিয়ে তাকে স্কোপোলামিন ও অন্য এক শক্তিশালী ড্রাগের প্রভাবে ফেলে।
অবচেতন, বিভ্রান্ত রায়হান নিঃশব্দে রাসেলের পিছু নিল।
দূর থেকে বিষয়টি খেয়াল করলেন পুলিশ সদস্য হোসেন।
তিনি রায়হানকে চিনতেন।
চুপচাপ অনুসরণ করতে লাগলেন।
এক নির্জন বাড়িতে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল দুই নারী।
মাদকাসক্ত বিভ্রমের মধ্যে রায়হানকে ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হলো।
চেতনা ফেরার আগেই তাকে বাড়ির পাশের মাঠে ফেলে রেখে চলে গেল তারা।
জ্ঞান ফিরে রায়হান অবাক হলো- সে এখানে কেন?
কিছুই মনে পড়ল না।
পরদিন রাসেল সেই ভিডিও সুমির সামনে তুলে ধরল।
প্রথমে সুমি বিশ্বাস করতে চাইল না।
সে প্রযুক্তির সাহায্যে ভিডিও যাচাই করল।
সবকিছু সত্যি দেখাল।
তার ভালোবাসা মুহূর্তে জ্বলে উঠল অগ্নিগিরির মতো ক্রোধে।
তার চোখে রায়হান হয়ে গেল বিশ্বাসঘাতক।
সেই ভুল বোঝাবুঝির আগুনে জুলেখা বানু আর রাসেল ঢেলে দিল বিষ।
সিদ্ধান্ত হলো-
রায়হানকে শেষ করে দিতে হবে।
সেই রাত।
নিশ্চুপ অন্ধকার।
রাতের খাবারে সুমি মিশিয়ে দিল ঘুমের ওষুধ।
ছোট্ট শান্তও খেয়ে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।
রায়হানের চোখ ভারী হয়ে আসছিল।
কিন্তু তার মেধা তাকে সতর্ক করল।
কিছু একটা অস্বাভাবিক।
সে উঠে দরজার দিকে যেতে চাইল।
পা টলতে লাগল।
মেঝেতে পড়ে গেল।
ঠিক তখনই দরজা ভেঙে ঢুকল রাসেল ও জুলেখা বানু।
রাসেলের হাতে মোটা দড়ি।
মুখে বিভৎস হাসি।
রায়হান মরিয়া হয়ে চিৎকার করতে চাইল-
কিন্তু তার কণ্ঠ ছিল না।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি-
আজ তার নীরবতা তার মৃত্যুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনজনে মিলে তার হাত-পা ওড়না দিয়ে বেঁধে ফেলল।
সুমি দাঁড়িয়ে কাঁপছিল।
চোখে জল, কিন্তু মনে প্রতিশোধের আগুন।
ঠিক তখনই-
বাইরে দরজায় জোর ধাক্কা।
“পুলিশ! দরজা খুলুন!”
হোসেনের বজ্রকণ্ঠ কেঁপে উঠল।
রাসেলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে দ্রুত দড়ি নিয়ে এগোতে চাইলো।
কিন্তু দ্বিতীয় মারাত্মক ধাক্কাতেই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল পুলিশ।
হোসেন সামনে।
তার সঙ্গে সেই দুই নারীও, যারা সব সত্য স্বীকার করেছিল।
একজন চিৎকার করে বলল,
“ও নির্দোষ! সব রাসেলের ফাঁদ!”
সুমির শরীর কেঁপে উঠল।
তার চোখ রায়হানের দিকে স্থির হয়ে গেল।
হাত-পা বাঁধা, অসহায়, চোখে অশ্রু আর অসীম আতঙ্ক।
সেই চোখে সে প্রথমবার সত্য দেখল।
রায়হান তাকে কখনো ঠকায়নি।
সে নিজেই ভালোবাসাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
রাসেল পালাতে গিয়ে হোসেনের হাতে ধরা পড়ল।
জুলেখা বানুও গ্রেপ্তার হলো।
ঘুম ভেঙে ছোট্ট শান্ত কান্না করতে করতে বাবার দিকে হামাগুড়ি দিল।
রায়হান তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল।
তার চোখ থেকে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
সুমি মেঝেতে বসে পড়ল।
কাঁদতে কাঁদতে রায়হানের পায়ের কাছে মাথা রাখল।
“আমাকে ক্ষমা করো…
রায়হান কিছু বলতে পারল না।
কিন্তু তার চোখে ছিল এমন এক বেদনা-
যা ভাষার চেয়েও গভীর।
সেদিন রাতের পর রায়হান বেঁচে গেল।
কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতর যে ফাঁসির দড়ি পড়েছিল-
সেটা আর কোনোদিন খুলল না।
কারণ সবচেয়ে গভীর ক্ষত শরীরে নয়,
“বিশ্বাসে লাগে”।
(চলবে…)
Leave a Reply