প্রতিবন্ধীর জীবন নিয়ে ছোট গল্প- (৩)
শুভ সাংবাদিক ও অশুভ শক্তির বিজয়।
——————————————–
লেখক: এ,এস,এম,রেজাউল করিম (পারভেজ)
জেলা শহরের ছোট্ট এক ভাড়া বাসায় থাকত সাংবাদিক শুভ। অল্প আয়, ছোট সংসার- তবুও তার জীবনে ছিল এক ধরনের শান্তি। তার স্ত্রী স্বর্ণা আর দুইটি জমজ শিশু সন্তান ছিল তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
শুভ ছিল সৎ, নীতিবান এবং সাহসী একজন সাংবাদিক। উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও বড় শহরে না গিয়ে সে জেলা শহরেই সাংবাদিকতা করত। তার বিশ্বাস ছিল,সত্য কথা বলার জন্য বড় শহর বড় পরিস্থিতি তৈরী করা দরকার হয় না, দরকার সাহস।
সংসারের আয় খুব বেশি ছিল না। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সে একটি এনজিওতে পার্ট-টাইম কাজ করত। অনেক সময় টাকার টানাটানি হলেও স্বর্ণা কখনো অভিযোগ করত না। বরং বলত-
“তুমি সত্যের পথে থাকো।যত সমস্যাই আসুক না কেন।
একদিন শুভ একটি গোপন খবর পেল।
শহরের কুখ্যাত অপরাধী বেলাল চৌধুরী গোপনে একটি বড় অপরাধচক্র চালায়। সেই চক্রের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জমি দখল, তাদের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া, এমনকি প্রতিবন্ধী নারীদের উপর নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ করা হয়। আরও ভয়ংকর খবর ছিল- প্রতিবন্ধীদের অঙ্গ পাচারের সাথেও তাদের সম্পর্ক থাকতে পারে।
খবরটি পাওয়ার পর শুভ অনুসন্ধান শুরু করল।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বিষয়টি জানতে পারে বেলাল চৌধুরী।
একদিন গোপনে শুভকে ডেকে পাঠানো হলো।
বেলাল চৌধুরী হাসতে হাসতে বলল,
“শুভ সাহেব, আপনি ভালো সাংবাদিক। আপনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে।”
তারপর টেবিলের উপর একটি ব্যাগ রাখল।
ব্যাগ খুলে দেখা গেল- টাকা।
“চল্লিশ লাখ টাকা। এই নিউজ বন্ধ করে দিন। আমার সাথে থাকলে অল্প দিনেই আপনাকে ধনী বানিয়ে দেব।”
শুভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্তভাবে বলল-
“আমি টাকার জন্য সাংবাদিকতা করি না।”
বেলালের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে ঠান্ডা গলায় বলল-
“তাহলে শুনুন। টাকা না নিলে অন্য পথে যেতে হবে। হয়তো পঞ্চাশ লাখ খরচ হবে, কিন্তু আপনাকে শেষ করে দিতে আমার সমস্যা হবে না।”
শুভ সেই দিনই বুঝেছিল,তার সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে।
তবুও সে থামল না।
এরপর শুরু হলো ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।
বেলাল চৌধুরী তার সহকারী কামরুলকে শুভকে ধ্বংস করার দায়িত্ব দিল। কামরুল আবার যোগাযোগ করল সাংবাদিকতার মুখোশ পরা কিছু অপরাধীর সাথে। তাদের নেতা ছিল কালু।
প্রথম আঘাত এল শুভর পত্রিকা থেকে।
কালু এবং কামরুল টাকা দিয়ে পত্রিকার বসকে কিনে ফেলল। কিছুদিনের মধ্যেই কৌশলে শুভকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলো।
বেতন বন্ধ হয়ে গেল।
বাড়িতে তখন কঠিন সময়। ছোট শিশুদের দুধ কিনতেও কষ্ট হচ্ছিল।
শুভ অনেক রাত পর্যন্ত চুপ করে বসে থাকত।
স্বর্ণা তার পাশে বসে বলত-
“ভয় পেও না। এই সময়ও একদিন শেষ হবে।”
কিন্তু অপরাধীদের ষড়যন্ত্র এখানেই থামল না।
তারা শুভর ইমেইলের মতো আরেকটি ইমেইল বানাল। তার ফোন নম্বরও ক্লোন করল।
তারপর শুভর নামে একটি ভয়ংকর ভুয়া সংবাদ তৈরি করে টিভি চ্যানেলে পাঠিয়ে দিল।
নিউজটি প্রচার হওয়ার সাথে সাথে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হলো।
চ্যানেলের কর্তৃপক্ষ যখন শুভকে ফোন করল, তখন ফোনটি পৌঁছাল অপরাধীদের কাছেই। তারা অ্যাপের মাধ্যমে শুভর কণ্ঠস্বর নকল করে নিশ্চিত করল যে নিউজটি সত্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আসল সত্য প্রকাশ পেল।
নিউজটি ভুয়া।
অভিযোগ এল,শুভ ভুয়া সংবাদ পাঠিয়েছে।
সেদিনই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।
শুধু তাই নয়,রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হলো।
জেলের অন্ধকার ঘরে বসে শুভ ভাবতে লাগল-
“সত্য কি সত্যিই এত দুর্বল?”আস্তে আস্তে শুভ বুঝতে লাগলো ষড়যন্ত্রের ফলে ওষুধের সংকটের কারণে সে মানসিক রোগের স্বীকার হয়ে যাচ্ছে।তার সব কিছু ঝপসা হয়ে আসছ…
বাইরে তখন স্বর্ণার জীবনও এক কঠিন সংগ্রাম।
স্বামীকে বাঁচানোর জন্য সে আদালত, এডভোকেট, কাগজপত্র নিয়ে ছুটতে লাগল।
প্রথমে কিছু আত্মীয় সাহায্য করল।
কিন্তু ধীরে ধীরে সবাই দূরে সরে যাচ্ছে। কারো ব্যস্ততার কারণে আত্মীয়-স্বজনরা সময় পাচ্ছেনা বলে অজুহাত দিচ্ছে …
একদিন জেলের সামনে স্বর্ণা দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখন সেখানে এলো বেলাল চৌধুরী।
তার সাথে কালু এবং কামরুল।
তারা স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।বেলাল বলল-
“দেখলেন তো? এই হলো সততার ফল।”
স্বর্ণা কিছু বলল না।
সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় এই আকাশটাকে তার খুব আপন মনে হতো।
আজ মনে হচ্ছে- এই আকাশও যেন অনেক দূরে সরে গেছে।
কিন্তু কোথাও না কোথাও হয়তো এখনও সত্য বেঁচে আছে।
হয়তো একদিন সেই সত্য আবার আলো হয়ে ফিরে আসবে। নয়তো আরো কঠিন অন্ধকার নিয়ে…
স্বর্ণ আকাশের দিকে আবার তাকায়। একসময় এই আকাশটাকে খুব ভালো লাগতো।এখন আর তা আপন মনে হয় না।আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা তার দৃষ্টিতে পড়লো।সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে।বেলাল চৌধুরীরাও প্রকৃতির নির্মম বজ্রের শব্দে ভয় পেয়ে গেল।তারা সরে গেল। কিন্তু ঝড়ের ভেতর স্বর্ণা দাড়ি আছে।কাছে আবারও বজ্রপাত হলো। স্বর্ণার ভুরুক্ষেপ নেই। স্বর্ণার জমজ শিশুগুলো ভয় পেয়ে কাঁদছে… কিন্তু স্বর্ণার অপলক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।সে দৃষ্টিতে অন্যরকম ছায়া। ভয়ংকর কোনো খুনি ছায়া…
(চলবে…)
Leave a Reply