প্রতিবন্ধীদের জীবন নিয়ে ছোট গল্প- (১) সুমি আর রহিমের হেরে যাওয়ার গল্প
নদীর পাড়ের সেই গ্রামটার নাম শালিকচর। সন্ধ্যা হলে এখানে কখনো কুয়াশা নামে ধীরে ধীরে, যেন আকাশ কারও কাঁধে শাল চাপিয়ে দিচ্ছে। সেই গ্রামেই যৌবনপ্রাপ্ত এক মেয়ের আবাস, নাম তার সুমি।
সুমি মানসিক প্রতিবন্ধী- ডাক্তারি ভাষায় “মৃদু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী”। সে ঠিকমতো সব কথা বুঝতে পারে না, কিন্তু মানুষের মুখের হাসি,আনন্দ, ভালবাসা আর কষ্ট চিনতে পারে খুব সহজে।
তার হাসিটা ছিল মুক্তোর মতো, হঠাৎ জ্বলে ওঠা রোদের মতো। ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে তার খুব ভালো ভাব। গ্রামের ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে সে খুব ভালোবাসত।আর গ্রামে নদীর ধারে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে ।হাসি আনন্দে মেতে থাকত প্রায় সব সময়। কেউ তাকে ডাকলে সে বিশ্বাস করত।হাসি মাখা মুখে এগিয়ে যেত কোন কুটিল সন্দেহ ছাড়াই।
রহিমের সঙ্গে তার পরিচয় খুব স্বাভাবিকভাবে। রহিম খেয়া পারাপার করত। নদীর ঘাটে নৌকা বাঁধত, মাছ ধরত। কখনও সুমিকে দেখে বলত,
– “এই সুমি, আবার একা একা ঘুরছো?”
সুমি হেসে বলত,
“নদী আমাকে ডাকছে।”
এই সহজ সরল কথা গুলোর ভেতরেই এক ধরনের নির্ভরতা জন্ম নেয়। রহিম তাকে খারাপ চোখে দেখত না। বরং কেউ ঠাট্টা করলে সে বাধা দিত। ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ বলাবলি শুরু করল- “ওদের মধ্যে কিছু আছে।”
ভালোবাসা হয়তো বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। ওরা একজন আরেকজনকে দেখলে খুশি হত। মুখে ছুঁয়ে যেতে অনাবিল হাসি।দৃষ্টিতে থাকতো নমনীয়তা ও পবিত্র এক অনুভূতি। রহিম কখনো গভীর ভাবে খোঁজ খবর নিত সুমির।একসময় তার অনুভব করল তারা একজন আরেকজনকে না দেখলে ভালো লাগে না। প্রতিবন্ধকতা কিংবা বাধা তাদের এই ভালো সম্পর্কে কোন প্রভাব ফেলতে পারল না।
তবু ওদের এই সম্পর্কে ছিল চুপচাপ, শালীনতায় ভরা, মায়া ও মনুষ্যত্বের এক স্বর্গীয় রূপ। ওদের প্রেম ছিল অনেকটা শান্ত নদীর জলের মতো চুপচাপ ও গভীর।এভাবে সুখেই চললো অনেকদিন।
এক ভর দুপুরে সুমি মানসিকভাবে বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়ে।
সেদিন বিকেলেসুমি হিতাহিত জ্ঞান ছাড়া পরিবারের সবাই তার অসুস্থতা বুঝার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
মা ভেবেছিলেন, আগের মতোই ঘাট পর্যন্ত যাবে, তারপর ফিরে আসবে। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামল, সুমি ফিরল না।
খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। শেষ রাতে গ্রামের পাশের বাগানঘেঁষা বাঁকে তাকে পাওয়া গেল- অচেতন, ছেঁড়া কাপড়, কাদা-মাখা শরীরে…
তারপরের দৃশ্যটা ছিল হাসপাতালের সাদা বিছানা, পুলিশের প্রশ্ন, আর মায়ের কান্না।
ডাক্তার বললেন, “ধর্ষণ হয়েছে।”
থানায় মামলা হলো, কিন্তু অভিযুক্তরা প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে। গাঁয়ের মাতব্বরেরা চাপ দিতে শুরু করল,“মেয়েটা তো এমনিতেই একটু…
মামলা করে লাভ কী?”
সুমি কিছুই স্পষ্ট করে বলতে পারল না। শুধু বলল, “ওরা বলেছিল ফুল দেখাবে…”
একটি মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ের সরলতাকে তারা টোপ বানিয়েছিল।
রহিম সুমির ধর্ষণের বিষয়টি জেনে প্রথমে পাগলের মত হয়ে যায়।
সে থানায় যায়, দোষীদের শাস্তি চায়। আর রহিমের পরিবারের লোকজন তখন ভিন্ন কথা বলে- তারা বলে, একে তো মেয়েটি প্রতিবন্ধী, তার উপর ধর্ষিত।এই প্রতিবন্ধী মেয়েকে বিয়ে করলে সমাজ কি বলবে?
“ও তো এখন কলঙ্কিত।”
রহিম চুপ করে যায়। ভিতরে ভিতরে সে সুমিকে ভালোবাসতই, কিন্তু তার সাহস ছিল না সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর।
একদিন সুমির বাড়িতে এসে সে শুধু বলল,
“আমি পারলাম না সুমি… আমাকে মাফ করো।”
সুমি কিছু বুঝল না। শুধু জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি শহরে চলে যাচ্ছ?”
রহিম মাথা নোয়াল।
সেদিন নদীর জল খুব স্থির ছিল।
গ্রামের প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেল,
কিছু মানুষ পাশে দাঁড়ালো,স্কুলের এক শিক্ষিকা নিয়মিত রুমার কাছে আসতে লাগলেন। স্থানীয় একটি প্রতিবন্ধী অধিকার সংগঠন চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করল।
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ফিসফিস করল-
“ও তো আগেই একটু আলাদা ছিল…
“এমন ঘটনা হলে মেয়েকে ঘরে রাখতে হয়…”
অন্যায়টা যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেল, দায়টা সুমির ঘাড়ে চাপল।
মামলাটা চলছে না, সাক্ষ্যপ্রমাণ, মেডিকেল রিপোর্ট- সবকিছু আইনের জটিল পথে আটকে আছে। সুমির বাবা কোর্টে যায় না। তিনি বুঝতে পারেন না আইনের ভাষা, শুধু জানেন- তার মেয়ের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।
সুমির আজকের জীবন:
সুমি আগের মতো বেশি হাসে না। এখন সে নদীর ধারে বসে পাথর ছোঁড়ে জলে। ঢেউ হয়, আবার মিলিয়ে যায়।
কাউন্সেলিংয়ের পর সে মাঝে মাঝে আঁকতে শেখে। তার খাতায় নদী, নৌকা, আর একজন ছেলে- দূরে দাঁড়িয়ে।
মাঝে মাঝে সে এখনও বলে,
“নদী আমাকে ডাকছে।”
কিন্তু এখন সেই ডাকে আছে এক অন্যধরণের বিষণ্নতা।
বাস্তবের প্রশ্ন:
এই গল্প শুধু প্রেম ভাঙার গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের আয়না-
যেখানে মানসিক প্রতিবন্ধী নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে,
যেখানে ধর্ষণের শিকারকেই সামাজিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়:
যেখানে প্রেম সাহস না পেলে ভেঙে পড়ে।
তবু গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ সুমি এখনও বেঁচে আছে। সে হাঁটে, শ্বাস নেয়, ছবি আঁকে।
হয়তো একদিন সে আবার হাসবে- অন্য রকমভাবে, নিজের শক্তিতে।
হয়তো একদিন গ্রামের মানুষ শিখবে, “কলঙ্ক” শব্দটা ভুক্তভোগীর জন্য নয়, অপরাধীর জন্য।
নদী যেমন থেমে থাকে না, সুমির জীবনও থেমে নেই।
সে এখনও নদীর ধারে হাঁটে।
হয়তো সে একদিন নিজের ভিতরেই খুঁজে পাবে সেই হারানো হাসিটা-
যেটা সমাজ কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি।
লেখক: এ,এস,এম,রেজাউল করিম (পারভেজ)
(চলবে)
Leave a Reply