প্রতিবন্ধীর জীবন নিয়ে ছোট গল্প- (২)
সমীর ও শবনমের ভালোবাসা, আর নকল পাগলা গারদ
লেখক: এ,এস,এম, রেজাউল করিম (পারভেজ)
শৈশবের কাদামাটির মাঠে দৌড়ে বেড়ানো দুই বন্ধু,সমীর ও আলম। একই স্কুল, একই বেঞ্চ, একই স্বপ্ন। সমীর ছিল মেধাবী, শান্ত, আর অদ্ভুত এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আলমও কম ছিল না, কিন্তু ভাগ্যের পাল্লা যেন সব সময় একটু বেশি ঝুঁকে থাকত সমীরের দিকে।
স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়,প্রতিটি পরীক্ষায় সমীর এগিয়ে। শিক্ষকদের প্রিয়, সহপাঠীদের ভরসার জায়গা। অথচ সবাই জানত না,সমীর বয়ে বেড়াচ্ছে এক নীরব ঝড়। ডাক্তারি ভাষায় তার অসুখের নাম সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)।
পরিবার জানত, চিকিৎসা চলছিল নিয়মিত। আধুনিক চিকিৎসায় সে ছিল প্রায় স্বাভাবিক। সামান্য কিছু ওষুধ, আর পরিবারের ভালোবাসা-এই ছিল তার ভরসা। কিন্তু সমাজ? সমাজ তাকে দেখে বলত-
“ও একটু অন্যরকম!”
এই “অন্যরকম” শব্দটাই যেন ছিল তার জীবনের প্রথম কারাগার।
প্রথম দেখা, প্রথম ভালোবাসা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন। ক্যাম্পাসে হালকা বাতাস বইছে। সমীর ও আলম হাঁটছে পাশাপাশি। সেইদিনই আলমের চোখে পড়ে এক মেয়ে-শবনম। সাদাসিধে পোশাক, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা।
আলম মুগ্ধ হয়। কিন্তু শবনমের দৃষ্টি গিয়ে থামে সমীরের উপর।
কয়েকদিন পর সুযোগ বুঝে শবনম নিজেই সমীরকে বলে,
“তোমাকে আমার ভালো লাগে।”
সমীর অবাক হয়েছিল।কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল । কারণ তাদের ম্যাচিং ছিল অসাধারণ।
ভালোবাসা ধীরে ধীরে গভীর হয়। দুজন বুঝতে পারে তারা শুধু প্রেমে নয়,একটি জীবনের স্বপ্নে জড়িয়ে গেছে।
শবনম জানত সমীরের অসুখ আছে। কিন্তু সে বলেছিল-
“এটা ক্যান্সার না, এটা লজ্জার না। এটা একটা চিকিৎসাযোগ্য অসুখ। যেমন প্রেসার কিংবা ডায়বেটিস, তেমনই।”
শবনম ছিল যুক্তিবাদী, কুসংস্কারমুক্ত। সে বলত-
“খুঁত ছাড়া মানুষ নেই। কেউ শরীরে অসুস্থ, কেউ মনে। তাই বলে কি সে মানুষ না?”তার তো অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে বেশি যোগ্যতা আছে।
আলমের ঈর্ষা
ভিতরে ভিতরে আলম পুড়ছিল।
যা সে চেয়েছে, সবকিছুতেই সমীর তাকে হারিয়েছে- এবার শবনমও?
সে শবনমকে বহুবার প্রস্তাব দেয়। ব্যর্থ হয়।
শেষবার শবনম বলেছিল-“সমীরকে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারব না। ওর অসুখ আছে, ঠিক আছে। কিন্তু ওর মন আছে। আমি ওর মনটাকে ভালোবাসি।”
এই কথাটাই আলমের অহংকারে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আলমের ষড়যন্ত্র :
আলম জানত সমীর নিয়মিত একটি ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে।
মোটা অংকের টাকায় সে দোকানদারকে কিনে নেয়। বাইরে থেকে আনা হয় দেখতে একই রকম নকল ওষুধ।
সেগুলো ছিল বিষের মতো। মানসিক ভারসাম্য ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সমীর বুঝতে পারেনি। সে নিয়মিত ওষুধ খেতে থাকে।
ধীরে ধীরে তার ভিতরের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।
শব্দ বেড়ে যায় মাথার ভেতর। সে মারাত্মক ভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে।
সমিরের পরিবারের লোকজন ভেঙে পড়ে।
সুযোগ নেয় আলম।
“চিন্তা কোরো না, আমি আছি।”
এই ‘আমি আছি’ কথাটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
নকল পাগলা গারদ:
শহরের বাইরে এক বাড়িতে তৈরি তথাকথিত মানসিক হাসপাতাল। ভেতরে অদ্ভুত গন্ধ-ওষুধ আর পচা স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের।
সেখানে সমীররকে ভর্তি করা হয়।
ভারী ইনজেকশন, ঘুমপাড়ানি ওষুধ।
তার হাত-পা অবশ।
চোখ খোলা, কিন্তু শরীর অচল।
সে সব শুনতে পায়। বুঝতে পারে। বলতে পারে না।
একদিন সে দেখে দেয়ালে নখের আঁচড়-
“আমি পাগল নই।”
“আমাকে বাঁচান।”
সেখানে আরও কয়েকজন অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষ- কারও পরিবার ফেলে গেছে লজ্জায়, কারও সম্পত্তির লোভে।
তাদের চোখে একই প্রশ্ন-
“আমরা কি অপরাধ করেছি?”
শবনমের অপেক্ষা:
শবনম প্রতিদিন ছাদে উঠে আকাশ দেখে।
তার মনে হয়, আকাশটা কি সমীরও দেখছে?
সে জানে না- সমীর একটি বন্ধ রুমে, জানালাহীন দেয়ালের ভিতর বন্দি।
একদিন সে আলমকে নিয়ে দেখতে যায়।
সমীরের চোখের দিকে তাকাতেই শবনম কেঁদে ওঠে।
সেই চোখে অসহায় আবেদন-
“আমাকে নিয়ে যাও।”
কিন্তু ঠোঁট নড়েনি।
নকল ডাক্তার বলে-
এখন“হার্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। অবস্থা সংকটাপন্ন।”
আলম পাশে দাঁড়িয়ে শীতল দৃষ্টি লুকায়।
চিঠি:
তিন দিন পর একটি টাইপ করা চিঠি সমীরের সামনে পড়ে শোনানো হয়।
“বন্ধু সমীর,তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল কারণ আমাদের পছন্দ এক ছিল।কিন্তু আমি সবসময় হেরেছি।বার হারব না।শবনম আমার হবে।আজ রাতেই তোর মৃত্যু হবে।একটাই ইনজেকশন।ক্ষমা করিস।”
ইতি,
আলম
সমীরের বুকের ভেতর রক্ত জমে যায়।
সে আকাশ দেখতে চায়।
মৃত্যুর আগে মানুষের যেমন শেষ ইচ্ছা থাকে- তার ইচ্ছে শুধু একবার শবনমকে দেখা।
কিন্তু প্রতিবন্ধীর ইচ্ছে কি এত সহজে পূরণ হয়?
শেষ রাত:
বাইরে লাশবাহী গাড়ির শব্দ।
টিক টিক ঘড়ির আওয়াজ।
পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে।
সমীরের চোখ দিয়ে বেদনার অশ্রু ঝরছে।
সে চিৎকার করে বলতে চায়-
“আমি বাঁচতে চাই!”
কিন্তু আগেই ইনজেকশন তার কণ্ঠ কেড়ে নিয়েছে।
তার মনে পড়ে-
শবনম বলেছিল,
“আমি কখনো তোমাকে ছাড়ব না।”
হয়তো শবনম এখনো অপেক্ষা করছে।
হয়তো সে জানেই না- তার ভালোবাসা মৃত্যুর করিডোরে দাঁড়িয়ে।
দরজা খুলে যায়।
সাদা পোশাকের মানুষটি এগিয়ে আসে।
সমীরের মনে শেষ প্রশ্ন-
“প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মানো কি অপরাধ?
আমার শেষ ইচ্ছে কি আকাশ দেখার অধিকারও পাবে না?”
ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই।
ইনজেকশন উঁচু হয়।
সমীরের চোখ খোলা।
অপলক।
আকাশ দেখা হয়নি।
শবনমের মুখও না।
শুধু তার চোখের কোণে জমে থাকা তীব্র বেদনার অশ্রু সাক্ষী-
একটি প্রতিবন্ধী হৃদয়ের অপূর্ণ শেষ ইচ্ছে।
প্রশ্নচিহ্ন?:
হয়তো পরদিন পত্রিকায় ছোট্ট একটি খবর ছাপা হবে-
“মানসিক রোগীর মৃত্যু।”
কেউ জানবে না-
এটি ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রতিবন্ধী জীবনের নির্মম সামাজিক হত্যার গল্প।
আর কোথাও একজন শবনম ছাদে বসে আকাশ দেখবে-
না জেনে, তার সমীর আর কোনোদিন সেই আকাশ দেখবে না।
এই গল্প শুধু সমীরের নয়।
এই গল্প সেইসব প্রতিবন্ধীদের-
যাদের কণ্ঠ রুদ্ধ,
যাদের অধিকার ছিনিয়ে নেয় সমাজ,
যাদের শেষ ইচ্ছাও অনেক সময় বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়…
Leave a Reply